
এলএনজি মজুত শেষ, এক্সিলারেট টার্মিনাল বন্ধ
ফের তীব্র গ্যাস সংকট, চাপে বিদ্যুৎ-শিল্প-বাসাবাড়ি
নিউজ ডেস্ক | আদালত বার্তা
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬
দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU)-এ মজুত এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকেল ৩টার দিকে টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি নতুন কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়নি; বরং টার্মিনালে পুনঃগ্যাসীকরণের জন্য পর্যাপ্ত এলএনজি মজুত না থাকায় সরবরাহ বন্ধ করতে হয়েছে।
সরবরাহ নেমেছে ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুরে সামিট ও এক্সিলারেট—দুই টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহ ছিল প্রায় ৬৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট (MMCFD)। সন্ধ্যা ৮টার দিকে এক্সিলারেটের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তা কমে প্রায় ৫৬১ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় ১০৫ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে।
এর প্রভাব পড়েছে জাতীয় গ্যাস সরবরাহের ওপরও। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক গ্যাসের মোট সরবরাহ ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। অথচ দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যেও চাহিদার বিপরীতে সরবরাহে বড় ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
কার্গো না আসায় বিপাকে টার্মিনাল
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসে বিশেষ ক্রয়প্রক্রিয়ায় এলএনজি আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় কার্গোগুলো না পৌঁছানোয় এক্সিলারেট টার্মিনালের মজুত ফুরিয়ে যায়।
সরকার এরই মধ্যে এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে অতিরিক্ত কার্গো কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। ১৭ আগস্ট সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দুটি এলএনজি কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর একটি কার্গো ২৩–২৪ আগস্ট দেশে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত হয়েছে; ওই কার্গোর মূল্য প্রায় ৯২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
ফলে এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সরবরাহ পুনরায় শুরু হতে আগামী কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
সামিট চালু থাকলেও কাটছে না ঘাটতি
বর্তমানে মহেশখালীর সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। সামিটের টার্মিনাল ১৪ আগস্ট আবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাস দেওয়া শুরু করে এবং পর্যায়ক্রমে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক সরবরাহে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
কিন্তু একক একটি টার্মিনালের সরবরাহ দিয়ে দেশের সামগ্রিক ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর আগে এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার কারণে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক সরবরাহ কমে গিয়েছিল। পরে আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু হলেও সেটি পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।
শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ঝুঁকি
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যায়, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল বা অন্যান্য ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইস্পাতসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি সরবরাহে বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় লোডশেডিং ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি।
বাসাবাড়ি ও সিএনজি স্টেশনেও ভোগান্তির আশঙ্কা
গ্যাসের জাতীয় সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে রান্নার সময় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন ও সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।
এর আগে গ্যাস সংকটের কারণে তিতাসের আওতাধীন আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি—সব ধরনের গ্রাহককে নিম্নচাপের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। দেশে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কূপ খনন, গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এলএনজি আমদানির জন্য নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করা জরুরি।
জাতীয় সংসদে সম্প্রতি দেওয়া তথ্যে দেশে উত্তোলনযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দৈনিক সরবরাহে প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি টার্মিনাল বা সরবরাহ চেইনে সমস্যা হলেই জাতীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সামনে কী?
আগামী কয়েক দিন দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২৩–২৪ আগস্টের সম্ভাব্য এলএনজি কার্গো সময়মতো দেশে পৌঁছে টার্মিনালে সরবরাহ করা গেলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে এর আগ পর্যন্ত গ্যাসের নিম্নচাপ, শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ এবং আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করলেও সংকটের মূল কারণ দূর হবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানি ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে এমন সংকট বারবার ফিরে আসতে পারে।

এলএনজি টার্মিনাল, কার্গো সরবরাহ ও দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল বর্তমান ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্নই যখন শিল্প, বিদ্যুৎ ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলছে, তখন জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।