
এআই দিয়ে রায় লেখা অনুচিত—প্রধান বিচারপতির সতর্কবার্তা
বিচারকের বিবেক, স্বাধীন বিচারিক মনন ও আইনের শাসন রক্ষায় প্রযুক্তির সীমারেখা জরুরি
সম্পাদকীয়| আদালত বার্তা | ২৯ আগস্ট ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কিন্তু বিচারব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা, কোথায় এবং কোন সীমার মধ্যে হবে—এই প্রশ্ন এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি বর্তমানের বাস্তব আইনগত প্রশ্ন। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
২৯ আগস্ট ২০২৬ রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘এআই গভর্নেন্স সামার স্কুল ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেন, এআই ব্যবহার করে আদালতের রায় লেখা অনুচিত। তাঁর মতে, একটি রায় নির্ভর করে মামলার প্রকৃত তথ্য, প্রযোজ্য আইন এবং সবশেষে বিচারকের নিজস্ব বুদ্ধি, বিবেক ও বিচারবোধের ওপর।
তিনি আরও সতর্ক করেন, এআইয়ের দেওয়া তথ্য বা নজির যাচাই না করে ব্যবহার করা বিপজ্জনক। উদাহরণ হিসেবে তিনি ইংল্যান্ডের একটি ঘটনায় এআই-উৎপাদিত এমন বিচারিক রেফারেন্সের কথা উল্লেখ করেন, যার বাস্তব অস্তিত্ব পরে পাওয়া যায়নি।
রায় কি শুধু তথ্য ও আইনের সমন্বয়?
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিচারিক সিদ্ধান্তকে কেবল তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ হিসেবে দেখা যাবে না।
একটি মামলা আদালতে এলে সেখানে থাকে সাক্ষ্য, দলিল, পারিপার্শ্বিকতা, সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা, আইনগত প্রশ্ন, পূর্ববর্তী নজির এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য। এসব উপাদান বিশ্লেষণের পর বিচারককে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের স্বাধীনতা, সম্পত্তি, সম্মান, পরিবার, এমনকি কখনো জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
এআই বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে; কিন্তু কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোন সাক্ষ্য সন্দেহাতীত, কোন পরিস্থিতিতে কোন আইনি নীতি প্রযোজ্য এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে কোন সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্য—এই চূড়ান্ত দায়িত্ব মানুষের কাছেই থাকতে হবে।
এখানেই প্রধান বিচারপতির ‘বিবেক’-এর কথাটি গুরুত্বপূর্ণ।
এআই বিচারকের সহকারী হতে পারে, বিচারক নয়
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যকে এআই-বিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখলে বিষয়টির মূল তাৎপর্য হারিয়ে যাবে। বরং তাঁর বক্তব্যকে ‘Human-controlled AI’ বা মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রযুক্তি ব্যবহারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সতর্কতা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এআই আদালতে সহায়ক হতে পারে—
বিপুল সংখ্যক নথি সাজাতে;
মামলার তথ্য শ্রেণিবিন্যাস করতে;
পূর্ববর্তী রায় খুঁজে দিতে;
আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা শনাক্ত করতে;
দীর্ঘ নথির সারসংক্ষেপ তৈরিতে;
মামলার ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাজে;
অনুবাদ ও ট্রান্সক্রিপশনে;
মামলার তথ্যভান্ডার অনুসন্ধানে।
কিন্তু রায়ের চূড়ান্ত যুক্তি, সিদ্ধান্ত ও দায় বিচারকেরই হতে হবে।
কারণ একটি ভুল সারসংক্ষেপ সংশোধন করা যায়; কিন্তু ভুল বিচারিক সিদ্ধান্ত একজন মানুষের স্বাধীনতা বা অধিকারকে অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এআইয়ের ‘হ্যালুসিনেশন’ বিচারব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি
এআইয়ের অন্যতম আলোচিত সমস্যা হলো hallucination—অর্থাৎ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমন তথ্য, আইন, মামলা বা রেফারেন্স উপস্থাপন করা যার বাস্তব ভিত্তি নেই।
আইনি ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও ভয়াবহ। একজন বিচারক যদি কোনো অস্তিত্বহীন মামলার নজিরকে সত্য বলে ধরে নেন, তাহলে সেই ভুল নজিরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সিদ্ধান্ত পরবর্তী পর্যায়ে গুরুতর ন্যায়বিচার-সংকট তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এআই-নির্ভর আইনি কাজের ক্ষেত্রে এমন ভুলের বিষয়ে সতর্কতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় আদালত ও আইনজীবীদের এআই-উৎপাদিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অতএব, ‘AI said it, therefore it is true’—বিচারব্যবস্থায় এই ধারণার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মামলার চাপ ও দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় বাস্তবতা। এ কারণে এআইকে বিচারিক ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থায় এআই নিয়ে গবেষণাও শুরু হয়েছে; খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৬ সালে ‘Artificial Intelligence and the Judiciary in Bangladesh’ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন আর ‘এআই আদালতে আসবে কি না’—এ পর্যায়ে নেই। বরং প্রশ্ন হলো—এআই এলে তার সীমা কোথায় নির্ধারণ করা হবে?
বাংলাদেশের জাতীয় এআই নীতি ২০২৬–২০৩০-এর খসড়ার দ্বিতীয় সংস্করণও আগস্ট ২০২৬-এ জনসাধারণের পর্যালোচনার জন্য প্রকাশিত হয়েছে। এতে এআই ব্যবহারের জন্য একটি জাতীয় নীতিগত কাঠামো তৈরির উদ্যোগের প্রতিফলন রয়েছে।
বিচারব্যবস্থায় এআই ব্যবহারে কী ধরনের আইন প্রয়োজন?
প্রধান বিচারপতি নিজেই বলেছেন, বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের জন্য আইনগত কাঠামো প্রয়োজন।
আমাদের মতে, ভবিষ্যৎ আইনি কাঠামোতে অন্তত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—
প্রথমত, বিচারিক সিদ্ধান্তের দায় মানুষের ওপরই থাকবে।
কোনো বিচারক বা আদালত এআইকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন না।
দ্বিতীয়ত, AI-generated legal authorities বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করতে হবে।
মামলার নজির, আইনের ধারা, উদ্ধৃতি ও তথ্য আদালতের স্বীকৃত উৎস থেকে যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।
তৃতীয়ত, গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।
বিচারাধীন মামলার নথি, ব্যক্তিগত তথ্য, সাক্ষীর পরিচয় বা সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় তথ্য যেকোনো উন্মুক্ত এআই প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করানো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চতুর্থত, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত মোকাবিলা করতে হবে।
এআই যে তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়েছে তার মধ্যে পক্ষপাত থাকলে তার ফলাফলও পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে।
পঞ্চমত, দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করতে হবে।
এআইয়ের ভুলে কোনো নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায় কার—ব্যবহারকারী, প্রতিষ্ঠান, সফটওয়্যার নির্মাতা নাকি রাষ্ট্র—এই প্রশ্নের উত্তর আইনে থাকতে হবে।
তবে সমালোচনার জায়গাটিও আছে
প্রধান বিচারপতির সতর্কবার্তার সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত হয়েও একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়—এআই যদি রায় লিখতে না পারে, তবে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও গবেষণামূলক কাজে এর ব্যবহার কতটা অনুমোদিত হবে?
কারণ সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে অস্বীকার করতে পারে। বিপরীতে লাগামহীন ব্যবহার বিচারিক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সুতরাং সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান সম্ভবত—
এআইকে নিষিদ্ধ নয়, নিয়ন্ত্রিত করতে হবে;
এআইকে বিচারকের বিকল্প নয়, বিচারকের সহায়ক করতে হবে।
বিশ্বের অন্যান্য বিচারব্যবস্থাতেও এই ‘human oversight’ বা মানবীয় তদারকির ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ফিলিপাইনের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৬ সালে বিচারব্যবস্থায় মানবকেন্দ্রিক ‘augmented intelligence’ ব্যবহারের জন্য একটি governance framework নিয়ে কাজ করেছে এবং মানবাধিকার, বৈষম্য ও মানবীয় নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
বিচারকের বিবেকই শেষ আশ্রয়
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের গভীরতম শিক্ষা সম্ভবত প্রযুক্তির বিরোধিতা নয়; বরং বিচারের মানবিক চরিত্র রক্ষা করা।
একটি কম্পিউটার তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধকে নিজের বিবেক দিয়ে অনুভব করতে পারে না। বিচারককে তাই শুধু আইন জানতে হবে না; তাকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে হবে, যুক্তি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং নিজের সিদ্ধান্তের নৈতিক ও আইনগত দায় গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনের আশ্রয় এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নিশ্চয়তার যে কাঠামো রয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহারও শেষ পর্যন্ত সেই সাংবিধানিক মূল্যবোধের অধীনেই হতে হবে।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর বক্তব্য তাই শুধু ‘এআই দিয়ে রায় লেখা যাবে না’—এমন একটি সতর্কবাণী নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি-নীতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে এনেছে।
প্রযুক্তি বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের মালিক হতে পারে না।
মামলার তথ্য এআই সাজিয়ে দিতে পারে, আইন খুঁজে দিতে পারে, নজির শনাক্ত করতে পারে—কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেই বিচারককেই, যিনি সংবিধান, আইন, সাক্ষ্য-প্রমাণ, যুক্তি এবং নিজের স্বাধীন বিচারবোধের কাছে দায়বদ্ধ।
অতএব ভবিষ্যতের বিচারব্যবস্থার সঠিক দর্শন হতে পারে—
“AI may assist justice, but AI must never replace the judge.”
এ কারণেই প্রধান বিচারপতির বক্তব্যকে প্রযুক্তিবিরোধী বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং আইনের শাসন, বিচারিক স্বাধীনতা, মানবিক বিবেক ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় প্রযুক্তির সঠিক সীমারেখা নির্ধারণের আহ্বান হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।